Uncategorized

সময়ের ট্রেন

সেই নব্বই দশকের গোড়া থেকে আজ একবিংশ শতাব্দী। কালস্রোতে অনেকদূর ভেসে এসেছি। বয়স কি কম হলো! মানুষকে বলা হয় “a traveller Between life and death” মৃত্যু কখন এসে সামনে দাড়ায় সেই ভাবনায় দিন কাটে। আজ জীবনের পঁচিশ তম বসন্তে দাঁড়িয়ে দেখি আমার অতীত আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে, সে ডাক উপেক্ষা করা কঠিন। আমরা বর্তমান নিয়ে বসবাস করছি, ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা—কল্পনা করি। পেছনে যা ফেলে আসি তা অতীত। আর যা নিয়ে আমরা কথা বলি তাই হয়ে যায় স্মৃতিচারণ। প্রতিমূহূর্তে আমাদের মৃত্যু হয় আবার প্রতিমূহূর্তে বেঁচে উঠি। এই মৃত সময়গুলোকে একত্র করলে সেটাই হয়ে উঠে স্মৃতি—বিস্মৃতি। জীবনের তিন ভাগের এক ভাগই শেষ, সেহেতু স্মৃতিচারণের জন্য অনেকটাই অতীত আছে আমার। ভোর বেলা ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি নামলে, হেমন্তের ধূসর বিকেলে একঝাঁক বক আকাশ কাঁপিয়ে উড়ে গেলে কিংবা গ্রীষ্মময় দুপুরে প্রচন্ড রোদে কলাপাতা মড়মড়িয়ে উঠলে আমার বর্তমান যেনো কালবৈশাখী ঝড়ে উড়ে যাওয়া ধূলোর মতো উড়িয়ে নিয়ে যায় আমার ফেলে আসা দিনে। আমি অতীত মনে করতে চাই না। অনেকেই কষ্ট দিয়েছে দুঃখ দিয়েছে, অপে‣ায় বসিয়ে রেখেছে দিনমান। আমি এগুলো ভুলে যেতে চেয়েছি বারবার, কিšদ দুর্ভাগ্যক্রমে আমি অনেক কিছু ভুলি না। তবে স্মৃতি সত্যিই মধুর। স্মৃতির কাছে ফিরলেই পরিস্কার দেখতে পাই আমার ফেলে আসা সরল গ্রাম, নদী প্রান্তর খোলা মাঠ। মাঝে মাঝে ফেলে আসা দিনগুলোতে ফিরে যেতে মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। কিšদ সময় অ্যাবাউট টার্ন করে না। তাই পেছনের দিন গুলোতে তাকিয়ে স্মৃতির জাবর কেটে পা—পা করে সামনে আগাই। ছোটবেলা কেটেছে গ্রামে। একান্নবর্তী সংসারে নিম্নমধ্যবিত্ত জীবনযাপন ছিলো আমাদের। তখন আমাদের একটা প্রজন্ম ছিলো সবাই পিটেপিটি। উম্মাদের মতো আমরা দিকদিগন্তে ছুটে বেড়িয়েছি। বাড়ির পাশের সুরমা নদী সাঁতরে পার হয়েছি। বিরাট বিরাট মাঠ ঘুরে বেড়িয়েছি, সদলবলে গুলতি নিয়ে পাখির খুঁজে দিন কাটিয়েছি। বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা আমাদের শৈশবের চমৎকার দিনগুলোর কথা ভাবতেই পারবে না। অপরূপ ধানে—গানে ভরা গ্রাম শৈশব পাওয়া শেষ প্রজন্ম মনে হয় আমরাই ছিলাম। শৈশবে আমাদের গ্রামের অদূরে একটা বট গাছ ছিলো,তার ছায়ার নিচে মেলা বসতো প্রতি বৈশাখে।লোকেরা বলতো বান্নি। তার পাশে ছিলো একটা ভাঙ্গা মন্দির, সবাই বলতো এখানে ভূত—প্রেত আছে। খবরদার! কেউ যাবেনা। গা ছমছম করতে করতে তবু্ও গেছি। কিছু নেই, ভীষণ নির্জনতা ছাড়া। গ্রামের উত্তরে একটা দিঘি ছিলো, প্রচুর লালপন্স ফুটতো। আমরা দঙ্গল ছেলেরা দু’দলে ভাগ হয়ে এপার ওপার থেকে কাঁদা ছুড়াছুঁড়ি খেলতাম। এক সময় চোখ রক্তজবার মতো টকটকে লাল করে ভয়ে ভয়ে ঘরে ফিরতাম। আমাদের তখন একটা থিওরি ছিলো, নাম না জানা একটা পাতা আছে। সে পাতা বগলের নিচে বা পাতা খেলে চোখের লাল আভাটা কমে যায়,আমরা সে পাতা চিবুতে চিবুতে ঘরে ফিরতাম, তবে কাজ কতটুকু হতো বুঝতে না পারলেও পাতার উপর আমাদের বিশ্বাস ছিলো। আমাদের দুরন্তপনায় বিরক্ত হয়ে গ্রামের লোকজন বলতো পন্স দিঘিতে বিশাল কুন্ডলী আছে। মানুষ টানে। আমি হাবলা টাইপের হলেও সাহসী ছিলাম। একদিন লম্বা শ্বাস নিয়ে ডুব দিলাম। যতই নিচের দিকে এগুতে লাগলাম ততই ঠান্ডা পানি। যত নিচে নামছি তত ঠান্ডা বাড়ছে হিম ঠান্ডা। একেবারে তলায় গিয়ে দেখি কাদা। মুঠোভরে কাদা তুলে এনে প্রতিযোগিতা শুরু করি। প্রাইমারীতে পড়াকালীন ইশকুল পালাতাম খুব। কখনো বাড়ি থেকে ইশকুলের নাম নিয়ে বেড়িয়ে রাখালদের সাথে গরু চড়াতে চলে যেতাম। বর্ষায় জাম পাকতো, তিন চার ঘন্টা গাছেই কাটিয়ে দিতাম। পেট ভরে জাম খেয়ে সুর্য যখন মধ্যাকাশ থেকে হেলে পড়তো তখন গাছ থেকে নেমে বাড়ি ফিরতাম। মা ভাবতেন স্কুল থেকে ফিরছি। আমাদের শৈশবে সবচেয়ে বেশি মজা হতো ঈদ এলে। রোযা শেষের দিকে চলে এলে ঈদের কাপড় কিনে লুকিয়ে রাখতাম কাউকে দেখাতাম না। ঈদের সকালে সবাই মিলে হৈ—হুল্লা শুরু হতো পুকুরঘাটে। তারপর বের করতাম ঈদের পোশাক। কার পোশাক কতটুকু তা নিয়ে আনন্দের প্রতিযোগিতা হতো। ঈদুল আজহার দিন আমরা গরুর হাড্ডি জমিয়ে রাখতাম। বিকেলে সেগুলো বাড়ির পেছনের জঙ্গলে নিয়ে যেতাম। হাড্ডি গুলো রশি দিয়ে এমন ভাবে বেঁধে লটকিয়ে রাখতাম। যাতে সহজে ছুঁতে না পারা যায়। তারপর আমরা অবস্থান নিতাম খানিক দুরত্বের ঝেঁাপের আড়ালে, খেলা জমতো তখন। মাংসের গন্ধ পেয়ে গর্ত থেকে বেড়িয়ে আসতো শেয়াল। হাড্ডি ছুঁয়ার জন্য কি যে লম্ফঝম্প। একেকটার পাগলের মতো অবস্থা হতো। আমরা ঝেঁাপের আড়ালে বসে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেতাম। এরকম হাজারো স্মৃতি আছে শৈশবের। আমরা দুরন্ত ছিলাম।তবে কারো ‣তি করিনি কোনদিন । হিন্দু মুসলিম সবার সাথে আমাদের আন্তরিকতা ব্যাপক ছিল। তারপর একটু বড়ো হলাম যখন, গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসলাম। একা চলতে শিখে গেছি তখন। কেমন শান্তশিষ্ট হয়ে গেলাম। তার মূলে ছিলো পড়াশোনা আর মা বাবার কড়া শাসন। তখন আর পড়াশোনায় ফাঁকি দেই নি। প্রতিদিন ইশকুলে যেতাম। শেষবার যখন গ্রামে যাই তখন অনেক কিছু পাল্টে গেছে।কুপী হারিকেনের বদলে গ্রামে এসেছি ইলেক্ট্রিসিটি, ছনে ছাওয়া ঘরের জায়গায় আধপাকা টিনসেড ঘর। বন কেটে উজাড় সব। শৈশব স্মৃতি হিসেবে কেবল ঠিকে আছে ইশকুল ঘরের পাশে বাজ পড়া খেজুর গাছটা। ছোটবেলায় চাঁদনী রাতে গাছ দুটুকে মনে হতো বিশাল দৈত্য বুঝি তার দুপা মাটিতে রেখে সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে।

History, Uncategorized

ইউরোপে বাঙালীর ইসলাম চর্চা

দেশ ছেড়ে ইউরোপে পারি দিয়েছি বছর দুয়েকের একটু বেশি হবে । এ সময়টাতে অনেক রকমের মানুষ দেখেছি, কেউ আস্তিক কেউ বা নাস্তিক, কারো গায়ের রঙ সাদা কেউ বা একটু ঘোলাটে রঙের । কেউ বেশ সুখে আছে কারো বা জীবনে দুঃখের অন্ত নেই । সব মিলিয়েই তো জীবন- কিন্তু এসব কিছুর ঊর্ধ্বে আরও একটা জিনিস আছে যেটাকে আপনি উপেক্ষা করতে পারবেন না, যদি আপনি বিশ্বাসী হয়ে থাকেন । তা হলো- ধর্ম ।আমার মনে হয় এখানে বসবাসরত লোকজন, বিশেষ করে বাঙালিরা ইসলাম আর ইউরোপিয়ান সভ্যতাকে এক সুতোয় গাঁথতে গিয়ে বেশ হজবরল একটা পরিস্থিতি বানিয়ে ফেলেছে । তারা ক্রিসমাস নাকি ঈদ কোনটাকে বেশি প্রাধান্য দেয়া উচিত এ নিয়ে দ্বিধায় ভোগে । সমাজ বলে ক্রিসমাস আর আত্মা বলে ঈদ, স্কুলে বাচ্চাদেরকে শেখানো হয় ঈসা আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ক্রুশ বিদ্ধ করা হয়েছে আর বাসায় এসে তারা জানে তাকে আল্লাহ নিজের কাছে রেখেছেন । এই যে ইসলাম আর ক্রিশ্চিয়ানিজমের দ্বন্দে তারা ছোট বেলা থেকেই বড় হয় এইগুলো শিশুর মস্তিকে ভালো কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না । আবার কখনও কখনও সে তাঁর পরিবারের কারো কাছ থেকেও এসবের সুস্পষ্ট কোনো উত্তর পায় না । আর কাউকে যদি পারিবারিকভাবে ইসলামের সাধারন জ্ঞানটুকু দেয়া না যায়, বড় হওয়ার পর তাঁর জন্য ইসলামকে নিজের মধ্যে ধারন করা বেশ কষ্টসাধ্য । আমি বলছিনা অসম্ভব, হেদায়েত আল্লাহর হাতে তিনি যাকে ইচ্ছা সেই নূর দ্বারা নূরান্বিত করে থাকেন । তবে বাচ্চাদের জন্য ইসলামের প্রাথমিক শিক্ষাটা পরিবার থেকেই হওয়া উচিত । কিন্তু এখানে অমন খুব একটা হয় বলে আমি অন্তত মনে করি না । বাবা-মায়েরা অপেক্ষায় থাকেন একজন হুজুরের, যিনি এসে তাদের সন্তানকে জান্নাতের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে যাবেন । কিন্তু আদতে কি এটা সম্ভব!এখানকার বাচ্চারা সপ্তাহে ছুটি পায় দুই দিন, শনিবার ও রবিবার । এই দুইদিনই মূলত তারা ধর্মীয় জ্ঞান শেখার পেছনে ব্যয় করে । কেউ মসজিদে যায়, আবার কারো বাসায় হুজুর যান পড়াতে । আর সন্তান মোটামুটি কোরআন শরিফ পড়তে পারা মানেই হচ্ছে তাঁর দ্বীন শিক্ষা সমাপ্ত । মানে এখানে ইসলামী জ্ঞানের চূড়ান্ত পর্যায় হচ্ছে, কোনোমতে কোরআন শরিফ পড়তে পারা । ধরে নিচ্ছি দশ বছর বয়সে একটা ছেলে কোরআন শরিফ সমাপ্ত করলো, কিন্তু এরপর পরিবার থেকে তাকে আর মসজিদে যাওয়ার জন্য চাপ দেয়া হলো না অথবা বাসার হুজুরকে বিদায় করে দেয়া হলো । কিন্তু তাঁর কাছ থেকে কিন্তু এখানকার কথিত ইউরোপীয়ান সভ্যতা তারা দূর করতে পারেনি, বরং জীবনের পুরোটা সময় সে এই সভ্যতার বেড়াজালে থেকেই পার করবে । তাহলে তার জন্য কি অতটুকু দ্বীন শিক্ষা যথেষ্ঠ হতে পারে? আমি বলবো না । বরং এখানে দ্বীন শেখার বা শেখানোর প্রক্রিয়াটাকে আরও দীর্ঘ করা উচিত, সাথে প্রতিটা বাবা-মায়ের আরও সচেতন হওয়া উচিত ।সন্তানকে দ্বীনের জন্য উৎসাহিত করা বা সে জন্যে চাপ প্রয়োগ করার ব্যাপারটা পরে- এখানকার বাঙালি পিতা-মাতা কতটা ধর্মকর্মে মনোযোগী! যতদূর আমি দেখেছি বেশিরভাগ ফ্যামিলিই ধর্মের ব্যাপারে যথেষ্ঠ উদাসীন । মোটামুটি মানের ধর্মভীরু খৃষ্টানরাও এখানে সপ্তাহে অন্তত একদিন নিয়ম করে গির্জায় যায়, আর উতসবের দিনে তো লোকাল বাসগুলোতে জায়গা পাওয়া মুশকিল । মানে তারা বেশ জোরেশোরে তাদের ধর্মীয় দিন/উতসবগুলি পালন করে থাকে । কিন্তু ঈদের দিনেও অনেক বাঙালি পুরুষকে দেখেছি যারা ঈদের নামাজ বাদ দিয়ে কাজে যাচ্ছে । জুমআ তো অনেক দূরের কথা । প্রায় সবাই নামাজের ব্যাপারে উদাসীন । ৯-১১ বছর বয়সী অনেক ছেলেকেই দেখেছি যারা শুক্রবারের নামাজ তথা জুমার নামাজের সাথে পরিচিত না । হুট করে জিজ্ঞেস করলে হা করে তাকিয়ে থাকে । এর অন্যতম কারন তাদের বাবা । মাসের প্রতিটি জুমা আদায় করেছেন এমন মুসল্লি খুঁজে পাওয়া খুবই দুষ্কর । আর এছাড়াও বাচ্চাদের স্কুল থাকে তাই শুক্রবারে মসজিদে বিশেষ কোনো নামাজ হয়ে থাকে, নিয়ে তারা খুব একটা মাথা ঘামায় না ।কিছুদিন আগে পার্শ্ববর্তী এক শহরের স্কুলে মুসলমান স্টুডেন্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় স্কুল কতৃপক্ষ পুরো প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছিলো ঈদ উপলক্ষ্যে । আমি সেটা শুনে আমাদের মসজিদে এক জুমায় প্রস্তাব করেছিলাম সকলে মিলে স্কুলের সাথে আলাপ করে শুক্রবারে জুমার সময় অন্তত আধা ঘন্টার একটা বিরতির ব্যবস্থা করতে, যাতে বাচ্চারা নামাজে আসতে পারে কিন্তু আজঅব্দি কেউ দ্বিতীয়বার সেই প্রসঙ্গ তুলেনি । ছেলে-মেয়েদেরকে স্কুলের হোমওয়ার্ক করানোর জন্য আফটার স্কুল প্রোগ্রাম, বাসায় হোম টিউটর রাখাসহ কত আয়োজন । অথচ এক লাইন আরবি সবক ছেলেমেয়েরা ঠিকমতো হুজুরকে পড়ে শোনাতে পারে না কারন সারা সপ্তাহে তারা আরবি বই ছুঁয়েও দেখেনি । এদিকে মসজিদের হুজুরকে বারবার প্রেশার দেয়া হয় কেনো তাদের সন্তানরা খুব অল্প সময়ে কোরআন নিতে পারছে না!আমাদের শহরটা খুব বেশি বড় না, সবমিলিয়ে প্রায় ১৫টি মসজিদ আছে এখানে কিন্তু দিনের বেশিরভাগ ওয়াক্তের নামাজই ইমাম সাহেব একা অথবা ২/৩জন মুসল্লি নিয়ে আদায় করেন ।ইউরোপে ইসলাম আবারও বিস্তার লাভ করতে শুরু করেছে আস্তে আস্তে কিন্তু সেই অনুযায়ী মানুষের জীবনে ইসলাম প্রভাব সেরকমভাবে ফুটে উঠছে বলে আমি মনে করি না । মানুষ সার্বক্ষনিক হারামের মধ্যে ডুবে থাকতে থাকতে এখন আর হালাল কষ্ট করে খুঁজে বের করার চেষ্টা করে না । তারা শুধুমাত্র সরাসরি এলকোহল- মদ, শূকর এগুলো থেকে বেঁচে থাকে । কিন্তু সন্তানের জন্য কিনে আনা চকলেট, কেক, জুস থেকে শুরু করে বাসাবাড়ির নিত্য প্রয়োজনীয় বিশেষকরে গরু কিংবা মুরগীর মাংস জবাইকৃত পশুর কি না, সেসব আর যাচাই করে দেখার প্রয়োজনীয়তা বোধ করে না । ফলশ্রুতিতে নিজেদের অসাবধানতার কারনে দিনের পর দিন হারাম খেয়ে যাচ্ছে তারা । কাউকে বলে দিলে উত্তর দেয়, কত আর খুঁজে খুঁজে খাওয়া যায় । ইসলাম কি এতই কঠিন, আল্লাহ কি আমাদের পরিস্থিতি দেখছেন না! ‘এ জন্যই বোধহয় বলা হয় যে, আল্লাহর রহমতের দিকে তাকিয়ে এত বেশী গোনাহে লীপ্ত হয়ো না যে আল্লাহ তোমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন । আল্লাহ পৃথিবীর মুসলমানদের সহায় হোন ।তবুও দিনশেষে আশা একটাই- ইউরোপে আবারও ইসলামী বিপ্লব ঘটুক, মসজিদগুলো থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসুক, মুছে যাক সব পাপ পঙ্কিলতা, নতুন করে গড়ে উঠুক আমাদের আল হামরা ।

History

যেমন দেখতে প্রাচীন শহর বোলোনিয়া

তামিম রায়হান ফজর নামাজের বেশ খানিকটা আগে বিছানা ছেড়ে ওঠলাম। রাতেই সবকিছু গোছানো ছিলো। তবুও সতর্কতার খাতিরে একবার ভালো করে দেখে নিলাম। তেমন কিছু অবশ্য নেয়ার নেই, একদিনের সলো ট্রিপে আর কিইবা নেবো! দুপুরের লাঞ্চ প্যাক, এক সেট অতিরিক্ত কাপড়, পাওয়ার ব্যাংক, চার্জারসহ টুকিটাকি প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি। সাথে নিয়েছি সৈয়দ মুজতবা আলীর দেশে-বিদেশে আর মির্জা গালিবের গুল-এ-নগমা, আমার ধারণা পাহাড়ে বসে গালিব পড়ার মধ্যে একটা অন্যরকম অনুভূতি আছে। বাসা থেকে বের হয়ে মসজিদের দিকে গেলাম, অন্যদিনের তুলনায় বেশ ঠান্ডা পড়েছে আজ। হাতে থাকা স্মার্ট ওয়াচ বলছে আজকের তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস। মসজিদে যেতে যেতে জামাআতের সময় হয়ে এলো। ফজরের মসজিদ মুসল্লী সঙ্কটে ভোগে, এ সঙ্কটটা দেশবিভূঁইয়ে একই। ইমাম সাহেবসহ মুসল্লি মাত্র হাতে গোণা কয়েকজন। নামাজান্তে  ইমাম সাহেবের চায়ের নিমন্ত্রণ, না করতে পারলাম না— ভদ্রলোক চা খুব দারুণ বানান। যাত্রাপূর্বে এক কাপ চা মন্দ না! ৭.৩০ স্টেশনে উপস্থিত হয়ে গেলাম, ট্রেন ছাড়তে তখনও প্রায় ১৫ মিনিট বাকি । যথাসময়ে চলতে শুরু করলো ট্রেন। গন্তব্য পার্শ্ববর্তী ছোট্ট সুন্দর শহর বোলোনিয়া। ইতালির অন্যতম জনবহুল শহর এটি। ১৯শ শতকে ইতালীয় এককীকরণের পর থেকে বোলোনিয়া শহরটি দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে। মুজতবা আলীর দেশে-বিদেশে খুলে বসলাম, কিছুক্ষন বাদেই বরাবর দিকের সিটে এক ভদ্রলোক এসে বসলেন। আমার দিকে তাকাতে নিজ থেকে তার সাথে কুশল বিনিময় করলাম। ভদ্রলোক খাঁটি নাপোলিতান। নাপোলিতান পিৎজা বিশ্বজুড়ে বেশ বিখ্যাত। কিন্তু ওই অঞ্চলের ভাষা বেশ দুর্বোধ্য; অন্তত আমার তাই মনে হয়। কথায় কথায় জানতে পারলাম পেশায় তিনি একজন ওয়াচ ম্যাকানিক। ঘড়ির কলকব্জা তাঁকে মুগ্ধ করে রেখেছে গত পঁচিশ বছর ধরে। অবশ্য ঘড়ির সাথে যে তার বিশেষ সখ্যতা আছে, আগেই সেটা টের পেয়েছিলাম হাতে থাকা Patek Philippe Grandmaster Chime এর হুবহু মাস্টার কপি দেখে। কপি বলার কারণ, সেই ঘড়ি  কোম্পানী এক পিসই বানিয়েছিলো, বর্তমানে তা কোনো এক কালেক্টরের বিশেষ সংগ্রহে আছে। উনি আমার হাতে থাকা বইটার প্রতি খুব আকৃষ্ট হলেন, তাকে মুজতবা আলী আর দেশে-বিদেশে নিয়ে বিস্তারিত বললাম। মনে হলো বেশ সন্তষ্ট উনি। জানতে চাইলেন কোথায় যাচ্ছি? বোলোনিয়া যাচ্ছি শুনে বেশ খুশি হলেন। ব্যবসার কাজে প্রায়ই নাকি যেতে ওদিকে, বেশ কিছু উপকারী টিপসও শেয়ার করলেন। ইতোমধ্যেই ট্রেন পরবর্তী একটা স্টেশনে এসে থামলো। ভদ্রলোক আমাকে বিদায় জানিয়ে নেমে গেলেন। ট্রেন চলতে শুরু করলো আবার। বইয়ে আর মনোযোগ দিতে পারলাম না। বাইরে তাকিয়ে সবুজের সমারোহ দেখলাম, সূর্য ততক্ষণে নিজের অস্তিত্ব বেশ জোরেশোরে জানান দেয়ার চেষ্টা করছে। একটা ঢালু পাহাড়ের পাশ দিয়ে ট্রেন দ্রুত চলে যাচ্ছে, বাতাসও তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলেছে, যেন প্রকৃতি ও প্রযুক্তির মধ্যে শক্তিমত্তার প্রতিযোগিতা চলছে। পাহাড়ের কোলজুড়ে নানান ফলমূল আর সবজির চাষ করে রেখেছেন পাহাড়ী কৃষকরা। কয়েকটা গাছ দেখলাম ফলভারে একেবারে মাটি ছুঁইছুঁই অবস্থা! নয়নাভিরাম প্রকৃতি দেখতে দেখতে কখন যে চোখের পাতা এক হয়ে গিয়েছিলো টের ই পাইনি। চোখ যখন মেলে ধরলাম ঘড়িতে তখন ০৮.১৫, মানে আমার নির্দিষ্ট স্টেশন আসতে আরও মিনিট পনেরো বাকি। আশেপাশের স্টাফদেরর ঘোরাঘুরি করতে দেখে, একটা ক্যাপাচিনো অর্ডার করলাম। সাধারণত কফিতে আমার বিশেষ আগ্রহ নেই, তবে মাঝেমধ্যে চেখে দেখি আরকি। খুব স্বাভাবিকভাবেই, সাধারন মূল্যের প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ টাকা গুণতে হলো সেই কফির জন্য। একদিক থেকে শান্তিও পেলাম, অন্তত কোনোভাবে হলেও আমরা বাঙালীরা ইউরোপিয়ানদের সঙ্গে এক কাতারে আছি! বিষয়টা মজাচ্ছলে আনন্দের। *** স্টেশন থেকে বের হয়েই পাশের একটা ট্যাবাকো স্টোরে ঢুকলাম শহরের একটা মানচিত্র নেয়ার জন্য। মূলত গত কয়েকদিন ইন্টারনেটে বেশ ঘাটাঘাটি করেছি বোলোনিয়া নিয়ে। এখানকার ইতিহাস-ঐতিহ্য, দর্শনীয় স্থান, খাবার-দাবারসহ মোটামুটি সবকিছু সম্পর্কে একটা ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করেছি। আর এ জন্যই কোনো ট্রাভেল এজেন্ট বুক করিনি। নিজে নিজে খুঁজে বের করার মাঝে একটা অ্যাডভেঞ্চারাস ব্যাপার আছে। সবকিছুতে অ্যাডভেঞ্চার খোঁজার এই নেশা কিশোর বয়সে রকিব হাসান আমাদের মাথায় ঢুকিয়েছিলেন “তিন গোয়েন্দা”র মাধ্যমে।  এতে অবশ্য হীতে বিপরীতও হয় অনেক সময়। দেশে থাকাকালীন সেবার বান্দরবান ট্রিপে বন্ধুরা মিলে এমনই এক অ্যাডভেঞ্চারের পরিকল্পনা করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত দেখা গেলো সন্ধ্যা বেলা এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি যেখানে না আছে কোনো খাবারের দোকান আর না তো কোনো থাকার বন্দোবস্ত! বাধ্য হয়ে এক স্থানীয় ভদ্রলোকের বাড়িতে আশ্রয় নিই সেই রাতে। তবে শহরজুড়ে ফ্রি ওয়াই-ফাই অফার করা কোনো স্থানে তেমন কোনো পরিস্থিতির সম্মুখিন হবো না—  এই বিশ্বাসে ম্যাপ হাতে হাঁটা শুরু করলাম। প্রথম গন্তব্য বোলোনিয়ার প্রসিদ্ধ due torri বা টু টাওয়ার্স । যা স্টেশন থেকে সামান্য কিছুটা দূরে শহরের একেবারে মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। ১১০৯ থেকে ১১২০ সালের মাঝামাঝি সময়ে গড়ে উঠে টাওয়ার দুটি। সেসময় ক্ষমতাসীন পরিবারগুলো নিজেদের শক্তিমত্তার জানান দিতে শহরজুড়ে উঁচু উঁচু টাওয়ার তৈরী করতো। কালের বিবর্তনে অন্যসবগুলো ধ্বসে পড়লেও, প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে আসিনেল্লি ও গারিসেন্দা টাওয়ার। প্রায় ৯৭ মিটার লম্বা আসিনেল্লি টাওয়ার বহু দূর থেকে দৃষ্টিগোচরে আসে, যেনো সারাজীবনে কৃত পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে অন্তিম মূহুর্ত পর্যন্ত এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার প্রতিজ্ঞা করেছে কোনো বিরাট আকৃতির দানব। অপরদিকে গারিসেন্দা টাওয়ার তুলনামূলক ছোট ও ডানদিকে হেলে গিয়েছে এবং যেকোনো সময় ধ্বসে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষ যথাযথ সতর্কতার সাথে ঐতিহাসিক এই স্থাপনা দুটি রক্ষা করার চেষ্টা করছে। দর্শনার্থীদের জন্য সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠার সুযোগ থাকলেও আজকে সংস্কারজনিত কাজের জন্য তা বন্ধ রেখেছে কর্তৃপক্ষ। ৪৯৭ ধাপ সিঁড়ি পেরিয়ে সুউচ্চতা থেকে শহর দেখার সুযোগ হাতছাড়া হলো। তাই ব্যর্থ মনোরথে ফিরলাম Sala Borsar দিকে। এখন গন্তব্য sala borsa, যেটি মূলত একটি পৌরসভা অফিস ছিলো। পরবর্তীতে নব্বই দশকের শেষের দিকে এটিকে আধুনিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং বৃহৎ পাবলিক লাইব্রেরীতে রূপ দেওয়া হয়। অনেক আগে সিলেটে বেড়াতে গিয়ে সেখানকার কোনো এক পাবলিক লাইব্রেরীতে প্রবেশ করে আমি অবাক হয়েছিলাম, বিশাল বড় ছিলো সেটি। যতদূর চোখ যায় শুধু বই আর বই, কোনটা রেখে কোনটা হাতে নিবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আজ তারচেয়ে কয়েকগুণ বেশি অবাক হলাম। এটাকে শুধুই লাইব্রেরী বললে ভুল হবে, বিশাল লাইব্রেরী, অডিটোরিয়াম, ল্যাবরেটরিসহ ভেতরে নানান আয়োজন। ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম ভেতরটা, নিচ তলার সামনেই একটা বড়সড় খোলা জায়গা, যেখানে কোনো একটা সেমিনার হচ্ছিলো। পেছনদিকে লাইব্রেরী, কি নেই সেখানে! বাংলা, ইংলিশ, আরবি, উর্দু, চাইনিজ, হিন্দি, লাতিন, স্প্যানিশসহ সম্ভবত পৃথিবীর প্রায় সবরকম ভাষার বই এখানে, এক ছাদের নিচে রয়েছে। শুধু বই-ই না বরং অডিও বুকের সিডি কিংবা বাচ্চাদের জন্য এনিমেটেড কার্টুন সিডিরও বিশাল সম্ভার রয়েছে এখানে। উপরের তলার বারান্দা জুড়ে চেয়ার-টেবিল বিছানো, স্টুডেন্টরা সেখানে নিজেদের ক্লাসওয়ার্ক কমপ্লিট করছে, কেউ বা ফ্রি ইন্টারনেটের সুবিধা উপভোগ করছে।  আবার বয়োজ্যেষ্ঠদেরকে দেখলাম খুব মনোযোগ দিয়ে পত্রিকা পড়বার কসরত করছে। পত্রিকার জন্য রয়েছে আলাদা জায়গা যেখানে দৈনিক পত্রিকা আর সাময়িকীগুলো রাখা হয়। তৃতীয় তলায় রয়েছে একটি ভাষার স্কুল, যেখানে নবাগত লোকজনদের বিনামূল্যে ইতালিয়ান ভাষা শিক্ষা দেওয়া হয়। বেশ সাজানো গোছানো আর পরিপাটি অভ্যন্তরীণ  জায়গাটা। ঘুরে ঘুরে বই দেখতে লাগলাম, কিন্তু, প্রায় ১২হাজার স্কয়ার ফিটের এই লাইব্রেরী যেনো আর শেষই হয় না। সূর্য কখন

Scroll to Top